যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা ও হুমকিতে শেয়ারবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশটির শেয়ারবাজারের সূচকগুলো নিম্নমুখী হয়েছে। তবে এর আগের দুই সপ্তাহে তা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। খবর রয়টার্স ও এপি।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেনে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’স ৫০০ (এসঅ্যান্ডপি ৫০০) সূচক দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে স্থির হয় ৬ হাজার ২৫৯ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। একই দিন ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল সূচক দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৩৭১ দশমিক ৫১ পয়েন্টে এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নাসডাক কম্পোজিট সূচক দশমিক ২২ শতাংশ কমে পৌঁছায় ২০ হাজার ৫৮৫ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে।
সপ্তাহজুড়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৩, ডাও ১ ও নাসডাক দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। তবে ২০২৫ সালে এখনো এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৬ শতাংশের মতো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। গত বৃহস্পতিবার তিনি ঘোষণা দেন, আগামী মাসে কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা শুরু হবে। একই সঙ্গে ব্রাজিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথাও বলেন। এছাড়া ওষুধে ২০০ ও তামার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন তিনি।
রোজেনব্লাট সিকিউরিটিজের ইকুইটি সেলস ট্রেডার মাইকেল জেমস বলেন, ‘ব্রাজিল ও কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের নতুন ঘোষণাগুলো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কিছুদিন ধরেই বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিলেন। তবে এখন আবার শুল্ক ইস্যু সামনে আসায় তারা নতুন করে সতর্কভাবে শেয়ারবাজার পর্যবেক্ষণ করছেন।’
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান উত্তর আমেরিকা অর্থনীতিবিদ পল অ্যাশওয়ার্থ বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা এখনো মনে করছেন যে ট্রাম্প হয়তো শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন। তবে আমরা এতটা আশাবাদী নই।’
এমন সময় এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যখন আগামী কিছুদিনে দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আয় প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করবে কোম্পানিগুলো। জেপি মরগান, নেটফ্লিক্স ও জনসন অ্যান্ড জনসনের মতো বড় কোম্পানি আগামী সপ্তাহেই তাদের আয় ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতির কারণে ব্যবসার খরচ বাড়তে পারে, যার প্রভাব কোম্পানিগুলোর আয় ও লাভে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ল্যান্ডসবার্গ বেনেট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মাইকেল ল্যান্ডসবার্গ বলেন, ‘বেশির ভাগ কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিক ছিল শুল্ক ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তায় ভরা। তাই এখানেই প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।’
ইইউর নতুন জরিমানার আশঙ্কায় শুক্রবার মেটা প্লাটফর্মসের শেয়ারমূল্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে ভিসা ও গিলিয়াড সায়েন্সেসের যথাক্রমে ২ দশমিক ২ ও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে। তবে ড্রোন প্রস্তুতকারী অ্যারোভাইরনমেন্ট ও ক্রেটোস ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সলিউশনসের শেয়ার ১১ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। কারণ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ড্রোন উৎপাদন ও মোতায়েন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তুলনামূলকভাবে কম শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এদিন দেশটির এক্সচেঞ্জগুলোয় মোট ১ হাজার ৫৪০ কোটি শেয়ার কেনাবেচা হয়, যা আগের ২০ কার্যদিবসের গড় ১ হাজার ৮৩০ কোটির চেয়ে কম। অন্যদিকে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে আয়ের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা আগের দিনের চেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অস্থিরতা যত দিন থাকবে, ততদিন শেয়ারবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। বাজারে ভরসা ফিরতে সময় লাগবে। যদিও কেউ কেউ আশাবাদী যে বড় কোনো ধস এড়ানো সম্ভব হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।